হালিশহর সেলিমের দোকানে ভিন্ন স্বাদের ১৫ রকমের চা |ভিন্ন ভিন্ন দিনে ভিন্নরকম চায়ের আয়োজন
গ্যাসের চুলোয় দুটি বড় কেতলিতে ফুটছে পানি। এর পাশেই বসে আছেন ছোট চুলের ছিমছামগড়নের সুঠামদেহী একটি মানুষ। তার সমানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কনডেনসড মিল্ক, চায়েরকাপ, আর চা তৈরির রঙ–বেরঙের বিভিন্ন উপাদানের কৌটো। খানিক বাদেই এসব উপকরণেরমধ্যমনি সেই মানুষটি চুলো থেকে একটি কেতলী তুলে নিলেন। এরপর তাঁর কুশলী হাতে চায়েরকাপে চা ঢাললেন। এরপর চিনি, দুধ মেশালেন। শুধু এখানেই শেষ নয়। চায়ের বাটিতে আরো কিছুউপদান যোগ করলেন পরিমাণ মতো। একটা মুনশিয়ানার ছাপ চোখে পড়লো তাঁর কাজে।বিক্রেতার সামনে টুলে বসা ক্রেতারা পরিতৃপ্তি নিয়েই সেই চা পান করলেন।
গতকাল রবিবার নগরীর ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ‘বি’ ব্লক শাহজাহান বেকারির মোড়ের একটুডানে টিনের ছাউনিযুক্ত ছোট দোকানটিতে এভাবে চায়ের বিকিকিনি দেখা যায়।
গত ১৫ বছর ধরে দোকানটি ভাড়া নিয়ে চায়ের ব্যবসা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা শের আলী ওরফেসেলিম। দোকানটি ক্রেতাদের কাছে ‘সেলিম ভাইয়ের ইত্যাদি চা ঘর’ নামে ব্যাপক পরিচিত। তবেআর দশটা চায়ের দোকানের মতো নয় এটি। এই দোকানের রয়েছে ভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট। কারণএখানে পাওয়া যায় রকমারি স্বাদের চা। ক্রেতার চাহিদা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছেন সেলিম।দোকানে একের পর এক গ্রাহক ঢুকছে। কেউ চাইছে মাসালা চা, কেউ হারবাল চা, আবার কেউবলছে ‘অনেকে দূর থেকে এসেছি লেমন চা–টা আগে দেন।’ এভাবে সবার পছন্দের চা তৈরি করেদিচ্ছেন।
সেলিমের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, প্রতিদিন বিকাল চারটায় দোকান খোলা হয় এবং টানা রাতদুইটা পর্যন্ত দোকান চলে। ক্রেতার চাহিদা মতো বিক্রি হয় চা বিক্রি। এই দোকানে ১৫ টি চায়েরআইটেম রয়েছে। তাছাড়া বিশেষ দিনে থাকে ভিন্নরকম চায়ের আয়োজন।
নিত্যদিনের চায়ের আইটেমের মধ্যে রয়েছে, প্রতি কাপ ২০ টাকা দামের হারবাল চা, ২০ টাকাদামের নারকেল চা, ২০ টাকার মাল্টা চা, ২০ টাকা দামে মাসালা চা, ১৫ টাকার লেমন চা, ১০ টাকাদামে লাল চা, ৮ টাকা দামে দুধ চা, ঈদে–কোরবানি এবং ফসলের মৌসুম ভেদে নানা স্বাদ ওউপকরণের চা। এরমধ্যে রয়েছে ৩০ টাকা দামে আম চা, ৩০ টাকা দামে আপেল চা, ৩০ টাকা দামেআনারস চা, ৩০ টাকা দামে মালাই চা, ৩০ টাকায় স্ট্রবেরি চা, ৩০ টাকা দামে তেতুঁল চা, ৩০ টাকাদামে আমলকি চা, ৩০ টাকা দামে জলপাই চা প্রভৃতি। সেলিমের দোকানে প্রতিদিন তিনশ কাপেরওবেশি চা বিক্রি হয়।
কার কাছ থেকে এসব চা তৈরির কাজ শিখেছেন জানতে চাইলে সেলিম বলেন, ‘দেখুন এটা কারোকাছে শেখা নয়, নিজের কিছু আইডিয়া যোগ করেছি এখানে। ছোটবেলায় দেখতাম, আমার বড় মা(জ্যাঠি) বনাজী ঔষধ তৈরি করতেন। সব উপকরণ আছদগঞ্জ থেকে কিনে আনা হতো। মাঝে মধ্যেআমাকেও পাঠাতো হতো। তখন আমি এসব উপকরণের গুণাগুণ বিবেচনা করে পরে চায়ের মধ্যেকয়েকটি ব্যবহার করে দেখলাম স্বাদে পরিবর্তন আসছে। এভাবে আমি নিজের মতো করে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে নানা স্বাদের চা তৈরি করতে থাকি। ক্রেতারাও সেই চা পানে পরিতৃপ্তি পাচ্ছিলেন।’
বিয়ে, গায়ে হলুদ এবং বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্যও চা বিক্রির অর্ডার নেয়া হয়। চায়েরপাশাপাশি এই দোকানে বিক্রি হচ্ছে পান সিগারেটও। মশলা দেয়া একটি পান বিক্রি হচ্ছে ২০টাকায়।
নগরীর আগ্রাবাদ থেকে চা খেতে আসা মহিউদ্দিন জানান, গত পাঁচ বছর ধরে এই দোকানে চা পানকরছেন। একদিন পান না করলে অস্বস্তি বোধ হয়। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে ছুটে আসেন।
নগরীর বন্দর, ফিরিঙ্গীবাজার, ক্রসিং, সি–বিচ, বন্দরটিলা, মাইলের মাথা, ভাটিয়ারি, ফৌজদারহাট, অক্সিজেন, মুরাদপুর, আতুরারডিপো প্রভৃতি এলাকা থেকে এখানে নিয়মিত চা পান করতে আসেনবিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। সরকারি ছুটি এবং শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে নারী ক্রেতারভিড় থাকে বলে জানান সেলিম।
স্ত্রী, এক ছেলে এবং এক মেয়ে নিয়ে সেলিমের সংসার। ছোট্ট এই চায়ের দোকানটিই জীবিকারএকমাত্র অবলম্বন। তিনি এভাবে নিজেকে সুখী বলে ভাবেন। বেশ ভালো আছেন বলে জানান।
Comments
Post a Comment