লালদিঘিস্থ পুরনো লাইব্রেরী ভেঙ্গে ১৩ কোটি টাকায় চসিকের নতুন লাইব্রেরি

লালদীঘি পাড়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১১৪ বছরের পুরোনো পাবলিক লাইব্রেরি ভবনটি ভেঙে ফেলে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন লাইব্রেরি ভবন। নির্মাণ কাজ শেষ হলে আরো উন্নত পরিবেশে বই পড়ার সুযোগ পাবেন নগরবাসী। সাড়ে তিন মাস আগে পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। ফলে এ লাইব্রেরিতে নিয়মিত যারা আসতেন তারা এখন বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। তবে লাইব্রেরি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঠকের সুবিধার্থে খুব শীঘ্রই অস্থায়ী ভিত্তিতে লাইব্রেরিটি বিকল্প স্থানে চালু করা হবে। অস্থায়ী ভিত্তিতে চালু করা যায় এমন স্থান চিহ্নিত করতে কাজও করছে ১৫ সদস্যের লাইব্রেরি উপ–কমিটি।
চসিকের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, লালদীঘি পাড়ের যে ভবনে চসিকের পাবলিক লাইব্রেরি ছিল সেখানে জাইকার অর্থায়নে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। ওই ভবনেই থাকবে চসিকের পাবলিক লাইব্রেরিটি। এ জন্য ‘রি–কনস্ট্রাকশন অব লালদীঘি সেন্ট্রাল ডিজেস্টার ম্যানেজমেন্ট কনট্রোল অফিস লাইব্রেরি অ্যান্ড কমিউনিটি কাম সাইক্লোন শেল্টার’ নামে একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হবে ৮ তলা বিশিষ্ট ভবন। ভবন নির্মাণে ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর ১২ কোটি ৯৭ লাখ ২৯ হাজার ৪৩৯ টাকায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। ইতোমধ্যে ভেঙ্গে ফেলা হয় তিন তলা বিশিষ্ট পুরাতন ভবনটি। বর্তমানে নতুন ভবনের ফাইলিংয়ে কাজ চলছে। ২০১৯ সালের শেষের দিকে নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, নতুন ভবনে লাইব্রেরির পাশাপাশি দুটো হল রুম থাকবে। এছাড়া ভবনটির বিভিন্ন তলায় থাকবে মিটিং রুম, জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম ইউনিট, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ইউনিট, পারচেজ ও প্রকিউরমেন্ট, স্টাটিসটিকস রুম, কনফিডেন্সিয়াল রেকর্ড রুম, টি রুম, এডুকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, ক্লাসরুম,, মিনি ক্যাফে, ডিজিটাল ল্যাব, ইনডোর গেমস, অফিসার্স রুম,স্টোর রুম, জিমনেসিয়াম, ডরমেটরি ও ভিআইপি রুম।
এদিকে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য গত অক্টোবর মাসে লাইব্রেরির ৪৫ হাজার বই সংরক্ষণের জন্য স্থানান্তর করা হয় বিবিরহাটস্থ সংস্থাটির আরবান হেলথ কমপ্লেক্স সেন্টারে। ওই হেলথ সেন্টারের তৃতীয় তলায় বর্তমানে বইগুলো বস্তাবন্দি করে রাখা হয়েছে। এদিকে বস্তাবন্দি করে বইগুলো সংরক্ষণ করায় সমালোচনা উঠেছে লাইব্রেরি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। কারণ বস্তাবন্দি করে সংরক্ষণ করলে বইগুলো নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
লালদীঘি পাড়ের লাইব্রেরিতে নিয়মিত যেতেন এমন লোকজন বিক্ল্প ব্যবস্থা না করে লাইব্রেরি ভবন ভেঙ্গে ফেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। করিম নামে একটি বেসরাকরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দৈনিক আজাদীকে বলছেন,পুরাতন ভবনটি ভাঙার আগে বিকল্প স্থান চিহ্নিত করা উচিত ছিল। অর্থাৎ অস্থায়ী ভিত্তিতে বিকল্প স্থানে লাইব্রেরিটি চালু না করে পুরাতন ভবন ভাঙা সমীচীন হয় নি।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্যরক্ষা বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাজমুল হক ডিউক দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প স্থানে লাইব্রেরিটি অস্থায়ীভাবে চালু করা হবে। স্থান নির্বাচনের জন্য চকবাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টুকে আহবায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উনি এ সংক্রান্ত রিপোর্ট মেয়র মহোদয়কে হস্তান্তর করবেন। এরপর নির্বাচিত স্থানে অস্থায়ী ভিত্তিতে লাইব্রেরিটি চালু করা হবে।’
ইতোমধ্যে বিকল্প স্থানের প্রস্তাব করা হয়েছিল কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বেশকিছু বিকল্প স্থানের প্রস্তাব ছিল। বর্তমানে যেখানে বইগুলো রাখা হয়েছে (বিবিরহাটস্থ চসিকের আরবান হেলথ কমপ্লেক্স) সেখানেও কেউ চাইলে পড়তে পারবেন। পড়ার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। তবে ওই জায়গাটা একটু দূরে হওয়ায় অস্থায়ী ভিত্তিতে চালু করা হয়তো সম্ভব না, এমন আলোচনাও হয়েছে। এনায়েত বাজার স্কুলের কথাও প্রস্তাবনায় ছিল। তবে ওই স্কুল ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় আছে। শহীদ মিনারের পাশেও আমাদের জায়গা আছে। ওখানে একটি শেড নির্মাণ করে চালু করার প্রস্তাবনায় ছিল। আবার নিউমার্কেট বা আশেপাশের এলাকায় বেশি লোকজনের যাতায়াত আছে। ওইদিকেও অস্থায়ীভাবে করা যায় কী না সেটাও প্রস্তাবনা আছে। রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনি সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের কথাও বলা হচ্ছে। আবার একটি লাইব্রেরির জন্য যে পরিবেশ থাকা দরকার সেটা ওইদিকে আছে কী না সেটাও দেখা হচ্ছে।’
চসিকের লাইব্রেরি উপ–কমিটির আহবায়ক ও ১৬ নং চকবাজার ওর্য়াড কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘লালদীঘি পাড়ের পাবলিক লাইব্রেরী ভবনটি ভাঙা হয়েছে। এখানে নতুন ভবন নির্মাণ কাজ চলছে। লাইব্রেরিতে যে বইগুলো ছিল সেগুলো বিবিরহাট হেলথ কমপ্লেক্সের (চসিকের ভবন) তৃতীয় তলায় সংরক্ষণ করেছি। তবে আমাদের পরিকল্পনা আছে, নির্মাণাধীন ভবনের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী ভিত্তিতে লাইব্রেরিটি চালু রাখা। এইক্ষেত্রে আমরা ভাবছি রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনি সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাদকে ব্যবহার করার। এ কাউন্সিলর বলেন, ‘লাইব্রেরির বিষয়ে সবাই আন্তরিক। আশা করছি শীগ্রই এর সুরাহা হবে।’
চসিকের সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত ছিল বইগুলো ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়ে সংরক্ষণ করা হবে। কিন্তু এখন বস্তাবন্দি করে রাখা হয়েছে হেলথ কমপ্লেক্সে। এতে বইগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে? এমন প্রশ্নে এ কাউন্সিলর বলেন, ‘যাতে নষ্ট না হয় সেভাবেই আমরা সংরক্ষণ করছি। ওয়ার্ড কার্যালয়ে স্পেস ছিল না। বড় স্পেস না পেলে বইগুলো রাখা যাবে না। তাই হেলথ কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে।’
নির্মাণাধীন ভবনের কাজের অগ্রগতি প্রসঙ্গে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘পুরোনো ভবনটি আমরা ভেঙে ফেলেছি। এখন নতুন ভবন নির্মাণের পাইলিংয়ের কাজ চলছে। এক তৃতীয়াংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী বর্ষার আগেই ফাউন্ডেশনের কাজ শেষ করে ফেলব। এখানে শুধু লাইব্রেরি না, আরো অনেক কিছুই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’
উল্লেখ্য, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত চট্টগ্রামের প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি হিসেবে ১৯০৪ সালে লাইব্রেরিটির যাত্রা শুরু হয়। তখন এটির নাম ছিল ‘চিটাগাং মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরি’। এই পাবলিক লাইব্রেরিতে আছে প্রাচীন ইংরেজি–বাংলা বই–সাময়িকী, ব্রিটিশ আমলের দলিল, গেজেট, প্যাটেন্টসহ দুষ্প্রাপ্য নানা গ্রন্থ।
Comments
Post a Comment