নান্দনিকতায় সাজবে লালদীঘি মাঠ

P-1-4-2-696x334.jpgলালদীঘি ময়দান। এটি কেবল একটি মাঠ নয়, বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। চট্টগ্রামের শত বছরের সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম স্থান এই মাঠ।


ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বাঙালি জাতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই মাঠের সাথে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা–সমাবেশের পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকা এই মাঠের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজ চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। ১০৮ বছর আগে এ মাঠে শুরু হওয়া জব্বারের বলীখেলাও এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায়।


ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত লালদীঘি মাঠকে ঘিরে এবার সৌন্দর্য বর্ধনসহ এক গুচ্ছ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নান্দনিকভাবে সাজানো হবে লালদীঘি মাঠ ও আশপাশের এলাকাকে। স্থানীয় ৩২ নং আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী এমন পরিকল্পনা নিয়েছেন। পরিকল্পনার আওতায় লালদীঘি মাঠের পূর্ব পাশের সীমানা দেয়ালে (সিএমপি কার্যালয়) হবে ম্যুরাল। এ ম্যুরালের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জব্বারের বলীখেলার ইতিহাস তুলে ধরা হবে। থাকবে বঙ্গবন্ধুসহ বিভিন্ন গুণীজনের প্রতিকৃতি। মাঠের উত্তর পাশে গ্যালারি এবং ওয়াকওয়ে করা হবে। লালদীঘির সামনের চৌরাস্তার মোড়ে মাস্টারদা সূর্যসেনের নামে একটি টাওয়ার বা ‘সূর্যসেন বাতিঘর’ বসানো হবে। জেলা পরিষদের সামনের সড়কের মিড আইল্যান্ডেও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ হবে।


১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন আওয়ামী সভানেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় নির্মমভাবে গুলিবর্ষণ করেছিল পুলিশ। ওই গণহত্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৪ জন। নিহতদের স্মরণে পুরাতন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভও নির্মাণ করা হবে। ওই স্তম্ভ ঘিরে থাকবে গ্যালারি।


জানা গেছে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদীকে লালদীঘির পূর্ব পাশের সীমানা দেয়ালে ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্রে অর্থায়নে প্রস্তাব দিয়েছেন কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী। দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক এ বিষয়ে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছেন। এছাড়া সূর্যসেন বাতিঘর, মিড আইল্যান্ড, মাঠের একপাশে ওয়াকওয়ে ও গ্যালারি করার জন্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ এবং গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে। জেলা পরিষদ মিড আইল্যান্ডে সৌন্দর্য বর্ধনে সম্মতি দিয়েছে। একইভাবে সিডিএও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজ শুরু করবে বলে জানা গেছে।


কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী দৈনিক আজাদীকে বলেন, লালদীঘি মাঠের পূর্বপাড়ে যে দেয়াল (সিএমপির সীমানা দেয়াল) রয়েছে, সেখানে ছয় দফা আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধুসহ গুণীজনদের ম্যুরাল নির্মাণে দৈনিক আজাদীকে প্রস্তাব দিয়েছি। লালদীঘি মাঠে গ্যালারি ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ, সূর্যসেন লাইট হাউজ নির্মাণ, মিড আইল্যান্ডের সৌন্দর্য বর্ধনে জেলা পরিষদে লিখিত প্রস্তাব দিয়েছি। সাথে ডিজাইনও সরবরাহ করেছি। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় চব্বিশজনকে হত্যার স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব দিয়েছি। দৈনিক আজাদী কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে সম্মতি জানিয়েছে। জেলা পরিষদ এবং সিডিএ আশ্বস্ত করেছে।


তিনি বলেন, লালদীঘি মাঠটি অনেক স্মৃতিবিজড়িত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার মাধ্যমে যে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিলেন, সেটাও এই লালদীঘি মাঠ থেকে হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক সূর্যসেনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল লালদীঘি মাঠ সংলগ্ন কারাগারে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের আগে সর্বশেষ জনসভা হয়েছিল এই মাঠে। লালদীঘি মাঠকেন্দ্রিক জব্বারের বলীখেলা ১১০ বছরে পদার্পণ করেছে। শহরের যেকোনো জনসভা, সমাবেশ লালদীঘি মাঠকে টার্গেট করে হয়ে থাকে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন–সংগ্রাম এই লালদীঘি মাঠকে ঘিরে শুরু হয়। এলাকার কাউন্সিলর হিসেবে লালদীঘির মাঠের এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে একটা উদ্যোগ নিয়েছি। দৈনিক আজাদীসহ সবাইকে এই কাজে সম্পৃক্ত করতে চাই। দৈনিক আজাদীর মাধ্যমে সবাই এগিয়ে এলে নান্দনিক সৌন্দর্যে ভরে উঠবে লালদীঘিসহ আশপাশের এলাকা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হবে বলে জানান হাজারী।


এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, সিডিএ নিহতদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করবে। এ মাসেই কাজ শুরু হবে। ডিজাইনের কাজ চলছে। প্রথমে একটি ডিজাইন করা হয়েছিল। কিন্তু ওটা সমৃদ্ধ না হওয়ায় আবারো ডিজাইন করা হচ্ছে। একসাথে ২৪ জনকে হত্যা সহজ কথা নয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন আওয়ামী সভানেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় নির্মম গুলিবর্ষণে ওই ২৪ জন নিহত হয়েছিলেন। তাদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ অবশ্য করা উচিত।


কাউন্সিলর হাজারীর প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জহরলাল হাজারী বলেছেন, করলে ভালো হবে। পরে আমি গিয়ে দেখেছি। ওটা যাচ্ছেতাই ভাবে পড়ে আছে। এরপর এ বিষয়ে আমরা ডিজাইনের কাজ শুরু করি।


চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ সালাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, লালদীঘি থেকে জেলা পরিষদ পর্যন্ত আইল্যান্ডের সৌন্দর্য বর্ধন, সূর্যসেন লাইট হাউজসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী। আইল্যান্ডের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ আমরা করে দেব। এটার প্রক্রিয়া চলছে। তবে সূর্যসেন লাইট হাউজের কাজটি আপাতত করছি না। তাছাড়া লালদীঘির মাঠটির মালিকানা মুসলিম হাই স্কুল কর্তৃপক্ষের। এখানে কিছু করতে গেলে স্কুল এবং সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন নিতে হবে।


উল্লেখ্য, লালদীঘি মাঠটি একসময় মিউনিসিপ্যাল মাঠ নামে পরিচিত ছিল। ১৮৮৭ সালে লালদীঘি মাঠে মহারানী ভিক্টোরিয়ার মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। চল্লিশের দশকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এই মূর্তি অপসারণ করা হয়। উনবিংশ শতকের শেষে উত্তর–দক্ষিণ রাস্তাটি হওয়ার পর মাঠটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব দিকটি খেলার মাঠে পরিণত হয়। মাঠটির মালিক মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়। লালদীঘি মাঠটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডে অবস্থিত।

Comments

LMP - Last Month Popular

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং| শীর্ষে ব্র্যাক, নর্থ সাউথ ও আইইউবি

ফোরজি সেবা পেতে জানতে হবে তিনটি তথ্য

সামনের সপ্তাহেই পুত্রকে সরাসরি সিংহাসনে বসাবেন বাদশাহ সালমান!