নিখোঁজ রোহিঙ্গা বাবা-মায়ের সংখ্যা অন্তত ৪৩,৭০০

নতুন এক মানবাধিকার প্রতিবেদনে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা হত্যার আলামত মিলেছে। আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ান ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর) নামের কমিটির ওই মানবাধিকার প্রতিবেদন বলছে, গত আগস্টে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো হওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গা শিশুর ৪৩ হাজার  বাবা –মা নিখোঁজ রয়েছেন। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত এপিএইচআর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো জরিপের ভিত্তিতে নতুন ওই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে । সেই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনের খবরে বলা হয়েছে, জরিপের ফলাফল প্রমাণ করে রাখাইনে নিহতের সংখ্যা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের স্বীকার করা সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে রাখাইনে গত আগস্ট থেকে মাত্র চারশো মানুষের নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।

এপিএইচআর রোহিঙ্গা বাবা মায়ের ওপর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে


নিরাপত্তাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর গত বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরোলো করে মিয়ানমার। নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন জনগোষ্ঠীর পরিচয়  পাওয়া রোহিঙ্গাদের বয়ানে উঠে আসতে থাকে রাখাইনে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো নৃশংসতার চিত্র।


এই বছরের ২১ থেকে ২৪ জানুয়ারি এপিএইচআর বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে তদন্তমূলক অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধান শেষে দেওয়া প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ২৮ হাজার তিনশো রোহিঙ্গা শিশু নিজেদের বাবা-মায়ের কমপক্ষে একজনকে হারিয়েছে। এছাড়া শিবিরের সাত হাজার সাতশো শিশু বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছে। আর এই দুই সংখ্যা মিলিয়ে রোহিঙ্গা শিশুর নিখোঁজ হওয়া বাবা-মায়ের সংখ্যা ৪৩ হাজার সাতশো।


বাবা-মা হারানো রোহিঙ্গা শিশু


এপিএইচআরের রিসার্চ ও এডভোকেসি পরিচালক অরেন সামেত মার্কিন সংবাদমাধ্যম টাইমসকে বলেছেন, ‘এই সংখ্যক রোহিঙ্গা শিশুর বাবা-মা তাদের সঙ্গে নেই। কারণ হয় তাদের হত্যা করা হয়েছে, অথবা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে আশঙ্কা রয়েছে না হয় তারা কোথায় রয়েছেন তার কোনও সন্ধান নেই।’ টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, আগে ধারণা করা হতো বাংলাদেশের অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরগুলোতে দুই  হাজার ৬৮০ জন রোহিঙ্গা শিশু বাবা-মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে পড়েছে। তবে এপিএইচআরের জরিপে পাওয়া তথ্য জানাচ্ছে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।


মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে রাখাইনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়াদের সংখ্যার বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য কোনও পরিসংখ্যান নেই। ওই অভিযানকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ আখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘ। ডক্টরর্স উইদাউট বর্ডারস নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ধারণা অভিযানের প্রথম এক মাসের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ৬ হাজার সাতশো রোহিঙ্গা।


আরেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ফরর্টিফাই রাইটসের কর্মকর্তা ম্যাথিউ স্মিথ বলেছেন নিখোঁজ বাবা-মায়ের সংখ্যা রাখাইনে চলমান নৃশংসতাকে উন্মোচন করা শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবাহিনীর লক্ষ্যবস্তু হওয়া এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরাদের কাছ থেকে পাওয়া যেসব তথ্য আমরা নথিভুক্ত করতে পেরেছি তাতে দেখা যায়, নিখোঁজ এসব বাবা-মায়েদের বড় অংশই হত্যার শিকার হয়েছেন। ২০১৬ সাল এবং আগস্টের পর থেকে আক্রমণের শিকার হওয়া তিনটি শহরতলিতেই নির্বিচার হত্যা ও গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে।’
এপিএইচআরের সভাপতি ও মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, আমার অনেক শিশুকে পেয়েছি যাদের বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে। পথচারি অথবা প্রতিবেশীরা জ্বলন্ত ঘর থেকে তাদের উদ্ধার করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে নিয়ে এসেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা বলছে,। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সম্ভাব্য মানব পাচারের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে। সান্তিয়াগো বলেন, আমার আশঙ্কা বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই মানব পাচার শুরু হবে। মানুষ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ছাড়াও যেখানে পারে সেখানেই যেতে চাইবে।
এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি রাখাইনে পাঁচটি গণকবর থাকার তথ্য প্রমাণ তুলে ধরে। সেসব প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা সহিংসতার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকা গু দার পাইন এলাকায় নিহতের সংখ্যা পুরো সংকটে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি করা সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, মিয়ানমার সরকারের নিহতের সংখ্যা চারশো দাবি করা একটি খারাপ মশকরা। নিজেদের তদন্ত চালানোর কথা ব্যবহার করে তারা নৃশংসতার ঘটনায় আরও স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তাকে আড়াল করতে চায়।


২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা কমপক্ষে ৬ লাখ ৭১ হাজার রোহিঙ্গার অনেকেই বুলেটের আঘাত বয়ে নিয়ে এসেছেন। অনেকেই বহন করছেন বিস্তৃত যৌন সহিংসতার প্রমাণ। পালিয়ে আসা এসব শরণার্থীদের ৬০ শতাংশই শিশু, যাদের অনেকের সঙ্গেই বাবা-মা নেই। শিশুদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, স্বজনদের হত্যার শিকার হতে দেখেছেন তারা। সেনাসদস্য ও স্থানীয়রা বাড়ি ঘিরে ফেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।


 

Comments

LMP - Last Month Popular

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং| শীর্ষে ব্র্যাক, নর্থ সাউথ ও আইইউবি

ফোরজি সেবা পেতে জানতে হবে তিনটি তথ্য

সামনের সপ্তাহেই পুত্রকে সরাসরি সিংহাসনে বসাবেন বাদশাহ সালমান!