সিডিএর মেগা প্রকল্পের কাজ চলতি মাসেই শুরু হচ্ছে

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পটির কাজ চলতি মাসেই শুরু হচ্ছে। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। গতকাল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পটির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সিডিএকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বর্ষা শুরুর আগে ৩৬টি খাল পরিষ্কার এবং খনন, মহেশখালসহ পাঁচটি খালের মুখে ুইচ গেট ও পাম্প হাউজ নির্মাণ, প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট ক্রয় এবং পরামর্শক নিয়োগের মতো অতি জরুরি কাজগুলো সম্পন্ন করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। নিয়োগকৃত পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তীতে প্রকল্পের বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পের অতি জরুরি কাজগুলো চলতি মাসেই শুরু করা হবে।
জলাবদ্ধতা চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। জলাবদ্ধতা থেকে নগরীকে মুক্ত করতে নানামুখী দাবি জানানো হলেও কার্যত কোন কাজ হচ্ছিল না। বিভিন্ন ভাবে প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হলেও নগরী প্রতিবছরই ডুবছিল। এই অবস্থায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ মহানগরীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুন:খনন, সম্প্রসারণ,সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করে। প্রায় একই সাথে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডও প্রকল্প দাখিল করে। গত ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের সভায় প্রকল্পগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিভিন্ন কথাবার্তাও হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের ওই সভায় সিডিএর প্রকল্পটিকে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেয়া হয়। ৫ হাজার ৬শ’ ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহিত প্রকল্পটির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে প্রধান করে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই টেকনিক্যাল কমিটিকে প্রকল্পটি যাছাই বাছাই করে ক্রুটি বিচ্যুতি চিহ্নিত করার দায়িত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ওইদিন বলেছিলেন, আপনারা এমনভাবে যাছাই বাছাই করবেন যাতে প্রকল্পটিতে অপ্রয়োজনীয় কোন কিছু না থাকে এবং প্রয়োজনীয় কোন কিছু যাতে বাদ না পড়ে। কাজ বাড়লেও অসুবিধা নেই। ব্যয় বাড়ুক বা কমুক তা নিয়ে চিন্তার কোন দরকার নেই। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম যাতে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পায় তা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে আহবায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করে প্রকল্পটি যাছাই বাছাই করতে সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করে দেন। সিডিএর চিফ ইঞ্জিনিয়ার কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের প্রধান প্রকৌশলীর সভাপতিত্বে ওই কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করে। কমিটি বেশ কিছু সুপারিশ তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটির নিকট উপস্থাপন করে।
কমিটি পুরো প্রকল্পটিকে দুইভাগে ভাগ করে সুপারিশমালা তৈরি করে। এরমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করার তাগাদা দেয়া হয় কয়েকটি খাতে। এরমধ্যে ৩৬টি খাল পরিস্কার এবং খনন কাজ বর্ষা আসার আগেই শুরু করার, ৩২০ কিলোমিটার সড়কের ড্রেন পরিস্কার এবং সংস্কার, মহেশখালসহ পাঁচটি খালের মুখে ুইচ গেট ও পাম্প হাউজ নির্মাণ কাজ শুরু, প্রকল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট জরুরি ভিত্তিতে ক্রয় করা, প্রকল্পের কাজ চলাকালীন খালগুলো পরিস্কার রাখার ব্যবস্থা করা, প্রকল্পটির জন্য দ্রুত পরামর্শক নিয়োগ দেয়া এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ডিটেইল ডিজাইন পাওয়ার পর পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হয়েছে। খালের দুইপাশে ১৭৬ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ এবং একপাশে ৮৫ কিলোমিটার আরসিসি রাস্তা নির্মাণের সুপারিশও করা হয়। ৪৮টি গার্ডার ব্রিজ, ৬টি কালভার্ট প্রতিস্থাপন এবং পাঁচটি ুইস গেটও নির্মাণ করা হবে। বিদ্যমান ড্রেন সংস্কার ও মেরামত করা হবে ৩০২ কিলোমিটার, নতুন ড্রেন নির্মান করা হবে ১০ কিলোমিটার। ৮৮০টি বৈদ্যুতিক পুল স্থাপন করা হবে। পুরো প্রকল্পটির জন্য জমি অধিগ্রহন করা হবে ১০৭ একর। এখানে উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে সিডিএর দুইটি প্রকল্পে ২৩টি ুইস গেটের অনুমোদন রয়েছে। উক্ত ২৩টির সাথে মহেশখালের ুইস গেটসহ এই প্রকল্পে নতুন করে আরো পাঁচটি ুইচ গেট নির্মাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সিডিএর দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, বর্ষা শুরুর আগেই ৩৬টি খালের ৫ লাখ ২৮ হাজার ২১৪ ঘনমিটার মাটি খনন করা হবে। খালের পাড়ে ১৭৬ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ এবং ৮৫ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পদস্থ একজন কর্মকর্তা গতকাল বলেছেন, নগরীর ৩৬টি খালের অবস্থা নাজুক। এসব খাল দখল হয়েছে। ভরাট হয়েছে। সিডিএ ইতোমধ্যে খালের ব্যাপারে আর এস জরিপ অনুযায়ী সার্ভে শুরু করেছে। খালগুলো উদ্ধার করে পুনখনন, সংস্কার এবং মাটি তোলা হবে। খালের পাড়ে রিটেইনিং ওয়াল এবং রাস্তা নির্মাণ করা হবে। বালি জমাটের জন্য খালে ৪২টি সিল–ট্র্যাপ্ট তৈরি এবং তিনটি জলাধার নির্মাণ করা হবে।
চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য গৃহায়ন ও গনপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে প্রধান করে একটি মনিটরিং কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি শুধু সিডিএরই নয়, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের সব কাজই তদারকি করবে।
গতকাল স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় থেকে প্রকল্পটির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ সিদ্ধান্ত পাওয়ার কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবদুচ ছালাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, সেনাবাহিনীর সহায়তায় দিন কয়েকের মধ্যেই আমরা কাজ শুরু করবো। প্রাথমিকভাবে আমরা জরুরি কাজগুলোতে হাত দেবো। পরামর্শকের ডিটেইল ডিজাইন পাওয়ার পর স্ট্রাকচারাল কার্যক্রম শুরু করবো। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটির কাজ অচিরেই শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিকতায় পুরো চট্টগ্রামবাসী কৃতজ্ঞ এবং অভিভূত বলে উল্লেখ করে বলেন, প্রকল্পটির ব্যাপারে আর কোন অনিশ্চয়তা নেই। সংশয় নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
If you found any objectionable or inappropriate stuffs over this content. please edit/improve that or you may trash/delete whole post by Log In with this following open credential.

Comments
Post a Comment