বাধা কাটিয়ে কার্যকর বাজেট দিচ্ছে উপজেলা পরিষদ
জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে টানাপোড়েনে উপজেলা পরিষদের বাজেট, পরিকল্পনা প্রণয়ন গতি পাচ্ছে না। উপজেলা পরিষদ আইনে স্থানীয় এলাকার বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শ বাধ্যতামূলক করায় এ সঙ্কট আরও তীব্রতর হয়েছে।
তবে বহুমাত্রিক সমস্যা এড়িয়ে দেশের বেশ কিছু উপজেলা এমপিদের বাদ দিয়েই নিজেদের বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, কোথাও কোথাও সফলতার সঙ্গে তা বাস্তবায়নও হচ্ছে। কয়েকটি উপজেলা পরিষদের বাজেট প্রণয়ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বিদ্যমান আইনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, উপজেলা পরিষদ বাজেট প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের কথাও। কিন্তু জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনাগ্রহে বেশিরভাগ উপজেলার সাধারণ জনগণ এ বিষয়ে কিছুই জানতে পারছেন না।
স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শে উপজেলা পরিষদের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা বাধ্যতামূলক করে আইনের ফলে জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনের মধ্যে মতভেদ প্রকট হয়েছে। সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যান ভিন্ন রাজনৈতিক মতদর্শের হলে সার্বিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে জটিলতা আরও প্রকট হয়।
তবে গত বছরের ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারের বেশকিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম উপজেলা পরিষদে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব দপ্তরের সব চাকুরেদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য ব্যয় নির্বাহে সরকারের দেয়া অর্থ সরাসরি উপজেলা পরিষদে জমা হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে সহায়ক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা।
কাগজে-কলমে সরকারি দপ্তর উপজেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বেশ কিছু বিষয় আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। আইনি এ প্রক্রিয়া শেষে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উন্নয়নে উপজেলা পরিষদ পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু উপজেলা পরিষদ নিজেদের পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ণের কাজ হাতে নিয়েছে। সফলও হয়েছে অনেকে। ছড়াচ্ছে আলোও।
উপজেলা পরিষদকে স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ‘উপজেলা পরিষদ বাজেট (প্রণয়ন ও অনুমোদন) বিধিমালা ২০১০’ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। কীভাবে বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন করতে হবে তারও বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে ওই প্রজ্ঞাপনে। বলা হয়েছে, অর্থবছরের ৩১ মে’র মধ্যে একটি বিশেষ সভায় অনুমোদনের মাধ্যমে এ বাজেট সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকের কাছে দাখিল করতে হবে।
উপজেলা পরিষদের পাঁচশালা কিংবা বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে বাজেট প্রণয়নের সম্পর্ক রেখে প্রজ্ঞাপনের ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, বাজেটে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ বা খাতসমূহ পাঁচশালা ও বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার নিরিখে করতে হবে এবং পরিকল্পনা বইতে অন্তর্ভুক্ত নেই এমন নতুন প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ রাখা যাবে না।
শুধু বাজেট প্রণয়ন কিংবা ঘোষণা নয়, এর সঙ্গে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেয়ারও নির্দেশনা রয়েছে আইনে। ‘জনমত সংগ্রহ ও প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রজ্ঞাপনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘খসড়া বাজেটের মুদ্রিত কপি উপজেলার প্রতিনিধিত্বকারী সংসদ সদস্য, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, স্থানীয় প্রেসক্লাবে প্রেরণ এবং উপজেলা পরিষদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এভাবে বিতরণ ও প্রচারণার পর খসড়া বাজেট ও পরিকল্পনা সম্পর্কে উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, পৌরসভা কাউন্সিলর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান, বেসরকারি সংস্থা, ব্যাংক, ব্যক্তি উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজের উপস্থিতিতে আলোচনা করতে হবে। যা উপজেলা পরিষদের সাধারণ বাজেট অধিবেশন হিসেবে গণ্য হবে। এ আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মতামত গ্রহণ বা বর্জন যাই করুক এইরূপ অধিবেশনের পূর্বে পরিষদ বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদন করবে না।’
প্রজ্ঞাপনে এমন ধারা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বেশিরভাগ উপজেলায় এসব আইন ও নির্দেশিকার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ তথা তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটে না। তবে সম্প্রতি এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বেশকিছু উপজেলা পরিষদ এই আইন মেনে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তারা সফলতাও পাচ্ছেন।
প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্থানীয় সরকারের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নের জন্য বেশকিছু সংস্থা এগিয়ে এসেছে। তাদের সহযোগিতায় উপজেলা পরিষদ আইন বাস্তবায়ন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সম্প্রতি নওগাঁ জেলার পত্নীতলা ও মান্দা উপজেলা পরিষদ আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করেছে।একইভাবে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা পরিষদ কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ওয়েভ ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের সহায়তায় বিভিন্ন স্তরের জনসাধারণের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বারের মতো ‘সাধারণ বাজেট অধিবেশন’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাজেটের আয় ও ব্যয়ের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, উপজেলা পরিষদ তখনই স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে, যখন সে তার নিজস্ব সম্পদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে। জনগণের সামনে বাজেট প্রণয়ন এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারে না। বিগত বছরের বাজেট পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি বাজেট আমাদের আলোর দিশারী হিসেবে কাজ করছে। আমরা এ বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে পারবো।
এ বিষয়ে গভর্নেন্স এডভোকেসি ফোরামের সমন্বয়কারী মহসিন আলী বাংলামেইলকে বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী করতে ‘উপজেলা পরিষদ আইন’ রয়েছে। এ আইনে বিভিন্ন পর্যায়ের জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামতে বাজেট প্রণয়নের কথা থাকলেও সাধারণভাবে বেশিরভাগ উপজেলায় প্রক্রিয়া অনুযায়ী এখনও বাজেট প্রণয়ন হচ্ছে না। পাশাপাশি ১৭টি ‘উপজেলা পরিষদ কমিটি’ গঠনের বিধান থাকলেও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কার্যকারিতা নেই।’
তিনি বলেন, ‘এ প্রেক্ষাপটে জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে বাজেট প্রণয়ন ও উপজেলা পরিষদ কমিটি কার্যকর করার মাধ্যমে শক্তিশালী উপজেলা পরিষদ কার্যকর করা সম্ভব হবে। সে লক্ষ্যে স্বল্প সংখ্যক হলেও যে সকল উপজেলায় আইনের বিধানগুলো কার্যকর হচ্ছে, তা বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া কার্যকর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
Comments
Post a Comment