জেএমবি সামরিক প্রধান জাবেদ হত্যার প্রতিশোধ নিতেই এসপির স্ত্রী হত্যা? : মাত্র ১৭ সেকেন্ডে তিন জঙ্গির কিলিং মিশন

২০১৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। সদরঘাট থানার মাঝিরঘাট এলাকায় এক ব্যবসায়ীর টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। জনতার তাড়া খেয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল উল্টে যায়। এ সময় বিস্ফোরিত হয় একটি ব্যাগে থাকা বোমা। এতে নিহত হন সত্যগোপাল ভৌমিক নামে এক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের দু’জন।
পুলিশ প্রাথমিকভাবে এ ঘটনাকে সাধারণ ছিনতাই বলে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে কর্মরত বাবুল আক্তার এর ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার প্রশ্ন, ছিনতাইকারীদের ব্যবহার করা বোমা এত শক্তিশালী হতে পারে না। এটি নিয়ে অনুসন্ধানে নামেন বাবুল। তার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ওই সময় বোমা বিস্ফোরণ হয়নি- বিস্ফোরণ হয়েছে গ্রেনেড। এ গ্রেনেড কিভাবে ছিনতাইকারীদের কাছে এলো? তিনি নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে থাকেন। এ পর্যায়ে দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতারও করেন। তারা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, জেএমবি তহবিল সংগ্রহ করার জন্য এ ছিনতাইটি করেছে। ছিনতাইকালে ব্যবহার করতে গ্রেনেড বহন করা হয়েছিল। দ্রুত গতির মোটরসাইকেল গর্তে পড়ে গেলে বিস্ফোরণ ঘটে। এ ছিনতাইয়ের নেতৃত্ব দেন জেএমবির সামরিক শাখার চট্টগ্রাম আঞ্চলিক প্রধান জাবেদ।
পিলে চমকানো এমন তথ্যের সূত্র ধরে চৌকস বাবুল আক্তার গত বছরের ৫ অক্টোবর কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর এলাকায় জেএমবির একটি আস্তানায় অভিযান চালান। সেখান থেকে আটটি হ্যান্ডগ্রেনেড ও বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ জেএমবির সামরিক প্রধান জাবেদসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়। আটককালে একটি গ্রেনেড নিয়ে বাবুল আক্তার ও অন্য গোয়ান্দা কর্মকর্তার দিকে ছুড়ে মারেন। কিন্তু গ্রেনেডটির পিন খুলতে ব্যর্থ হয়েছিল জাবেদ। এ যাত্রায় বেঁচে যান বাবুল আক্তার ও তার টিমের সদস্যরা।
পরদিন ৬ অক্টোবর ভোরে হাটহাজারি থানার অক্সিজেন এলাকায় জাবেদকে নিয়ে অভিযানে যান বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওই অভিযানে গিয়ে গ্রেনেড বিস্ফোরণে জাবেদ নিহত হয় বলে ওই সময় সিএমপি সদর দফতর থেকে দাবি করা হয়। খোয়াজ নগর জেএমবির আস্তানা থেকে আটক অন্য চারজন বুলবুল আহমেদ ওরফে ফুয়াদ, সদস্য মো. সুজন ওরফে বাবু, মাহবুব এবং শাহজাহান কাজল। চারজনকে বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন বাবুল আক্তার।
জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, জেএমবি সদস্যরা নিহত জাবেদের নেতৃত্বে ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামি থানার বাংলাবাজারে মাজারে ঢুকে ল্যাংটা ফকির ও আব্দুল কাদের নামে দু’জনকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে। সুজন ওরফে বাবু স্বীকার করে, মাজারে ঢুকে ল্যাংটা ফকির ও আবদুল কাদেরকে খুন করেছে সে। কাফেরকে খুন করলে জান্নাতবাসী হওয়া যাবে এমন ধারণা থেকেই সুজন ল্যাংটা ফকিরকে খুন করে। আর তাকে বাঁচাতে এসে খুন হয় খাদেম আব্দুল কাদেরও। দুটি ঘটনা ঘটায় জেএমবি। এর রহস্য উদঘাটন করেন বাবুল আক্তার।
২৪তম বিসিএসের পুলিশ অফিসার বাবুল আক্তার ওই দুটি রহস্য উদঘাটন করে উচ্চতর প্রশিক্ষণে চীনে চলে যান। জেএমবিবিরোধী অভিযানেও ভাটা পড়ে। দেড় মাসেরও বেশি সময় চীনে প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এসে আবারো তাক লাগিয়ে দেন বাবুল আক্তার। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর বাবুল আক্তার হাটহাজারি থানার আমানবাজারে ইসহাক ম্যানশনে তার টিম নিয়ে হাজির হন। এখানে ছিল জেএমবির আরেক সামরিক কমান্ডার ফারদিনের আস্তানা। সেখান থেকে একটি এমকে-১১ স্নাইপার রাইফেল, ২৫০ রাউন্ড গুলি, ২ কেজি জেল বিস্ফোরক, ১০টি ডেটোনেটর, বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৪টি পোশাক, নেমপ্লেট, ব্যাজ এবং সাংগঠনিক বিভিন্ন নথিপত্র পাওয়া যায়। এ সময় আটককৃত জেএমবি সদস্যরা হলেন- নয়ন, রাসেল ও ফয়সাল। এদের বয়স ২৪ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে।
উল্লেখ্য, উদ্ধার হওয়া অত্যাধুনিক স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করে ইউএস নেভি। আটক তিন জেএমবি সদস্য ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করে দেয়। আটক জেএমবি সদস্যরা পুলিশকে জানিয়েছিল, তাদের পরিকল্পনা ছিল সেনানিবাসে আত্মঘাতী হামলা করে বিশ্ব মিডিয়ায় তোলপাড় করা। সে জন্য তারা সামরিক বাহিনীর পোশাক ও ব্যাজ সংগ্রহ করে। মজুদ করেছিল অত্যাধুনিক অস্ত্র ও বিস্ফোরক।
একদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) ৮ বছর পর ঘুরে দাঁড়ানো ও হামলার পরিকল্পনা প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়া। অন্যদিকে সামরিক কমান্ডার জাবেদ হত্যার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি জেএমবি। ওই সময় থেকেই জেলের বাইরে থাকা জঙ্গিরা বাবুল আক্তার ও তার পরিবারকে টার্গেট করে। চট্টগ্রামে থাকাকালীন পুলিশ প্রহারা থাকা ও সতর্ক চলাফেরা করায় বাবুল আক্তারকে হত্যা করতে পারেনি জঙ্গিরা। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম থেকে হেড কোয়ার্টারে বদলি হওয়ার পর নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশাসনিক ও পাবিরারিকভাবে শীতল ছিল। এ শীতলতার পাশাপাশি, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের নামে এসএমএম দিয়ে, ‘অ্যাসেম্বলি’র কথা উল্লেখ করে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগে বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতুকে খুন করতে ডেকে নিয়েছিল জঙ্গি ঘাতকরা।
ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতুকে হত্যা করতে সময় লেগেছে মাত্র ১৭ সেকেন্ড। এ ক্ষিপ্র গতির ঘাতকরা এর মধ্যে তাকে ৮টি ধরালো ছুরিকাঘাত ও দুটি গুলি করে। এর মধ্যে একটি গুলি লাগেনি। তবে পালিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল চালু করতে সময় লাগে অন্তত ১৯ সেকেন্ড। ৩৬ সেকেন্ডের মধ্যে পুরো মিশন শেষ করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় তারা।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ঘড়ির কাঁটায় তখন ৬টা ৩২ মিনিট। মাহমুদা আক্তার মিতু ছেলে মাহিরের হাত ধরে গলির মুখে এসে পৌঁছান। এর ১৫ সেকেন্ড পর বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে আগে থেকেই অপেক্ষায় থাকা এক যুবক মোবাইলে কথা বলতে বলতে তাকে অনুসরণ করে পেছন পেছন হাঁটতে থাকেন। ওয়েল ফুডের সামনে পৌঁছানোর সঙ্গে ১ সেকেন্ডের ব্যবধানে পেছন থেকে দৌড়ে মিতুর দিকে এগিয়ে যায় ঘাতক। একই সময়ে মোটরসাইকেল নিয়ে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকা দুই যুবক মিতুর ওপর হামলা করে। প্রথমে মিতুকে ইট দিয়ে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেয়। এর আগ পর্যন্ত ছেলে মাহি তার মায়ের হাত ধরা ছিল। পড়ে যাওয়ার পর এলোপাতাড়ি ছুরি মারে। সর্বশেষ মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা।
কিলিং মিশনে অংশ নেয়া তিন ঘাতকের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর। মোটরসাইকেল চালক ছিল হেলমেট পরিহিত। তার পেছনে বসা দু’জনের মধ্যে মাঝখানের যুবকের হাতে ছুরি ও পেছনে বসা যুবকের কাছে পিস্তল ছিল। ৬টা ৩৩ মিনিট ৫ সেকেন্ডে খুনিরা কিলিং মিশন শেষ করে মোটরসাইকেলে চেপে বসে। তবে মোটরসাইকেলটি চালু হতে সময় নেয় ১৯ সেকেন্ড। ৬টা ৩৩ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে তিন খুনি মোটরসাইকেলে চড়ে নির্বিঘেœ পালিয়ে যায়।

Comments

LMP - Last Month Popular

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং| শীর্ষে ব্র্যাক, নর্থ সাউথ ও আইইউবি

ফোরজি সেবা পেতে জানতে হবে তিনটি তথ্য

সামনের সপ্তাহেই পুত্রকে সরাসরি সিংহাসনে বসাবেন বাদশাহ সালমান!